সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া নবজাতকদের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ঘটনাটি পুরো দেশের স্বাস্থ্য খাতকে নাড়া দিয়েছিল। সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসা প্রোটোকল এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেই সংকট ও রহস্যের মেঘ কাটিয়ে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ কেবল দুঃখ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নিজেদের সর্বোচ্চ আত্মশুদ্ধি ও আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে এক নজিরবিহীন দায়িত্বশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং সরকারের নির্দেশনাকে সম্মান জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনসহ অবকাঠামোগত ও মানবিক সহায়তার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে।

ডা. শেখ মহিউদ্দিনের পদত্যাগ ও নতুন নেতৃত্ব: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এর শীর্ষ নেতৃত্বে। ঘটনার নৈতিক দায় স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন তাঁর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন । পরিচালনা পর্ষদ এই গুরুত্বপূর্ণ গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করেছে অধ্যাপক জামালুন্নেসা পিএইচডি'র ওপর । উল্লেখ্য, অধ্যাপক জামালুন্নেসা বিগত ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতা করে সম্প্রতি স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন । ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করা এই গুণী ব্যক্তিত্ব পরবর্তীতে বিখ্যাত 'লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিন' থেকে পিএইচডি লাভ করেন । একজন আন্তর্জাতিক মানের অণুজীববিজ্ঞানীর হাতে হাসপাতালের নেতৃত্ব আসায় এর আইসিইউ, এনআইসিইউসহ সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ (Infection Control) প্রোটোকল আরও বেশি বৈজ্ঞানিক ও নিখুঁত হবে বলে মনে করছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ঐতিহাসিক মানবিক সহায়তা: অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ক্ষোভ ও বেদনার পাশে দাঁড়িয়ে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন এক অনন্য মানবিক ও আর্থিক সহায়তার (Ex Gratia Assistance) ঘোষণা দিয়েছে । আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নগদ ৮০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে । কেবল আর্থিক সাহায্যেই শেষ নয়, পরিবারগুলোকে আজীবন বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি এবং পরিবারের যোগ্য সদস্যদের কর্মসংস্থান সহায়তার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা এ দেশের চিকিৎসা খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন জবাবদিহিতা ও সহমর্মিতার উদাহরণ ।
অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন ও বেকারি বন্ধ: সরকারের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে । হাসপাতালে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল এবং প্রাকৃতিক অক্সিজেনের উপস্থিতি সুগম করার জন্য তিনজন স্বতন্ত্র বা ইন্ডিপেনডেন্ট কনসালটেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিমার্জনের কাজ পুরোদমে চলছে । এছাড়া, হাসপাতালের কর্পোরেট অফিসের ঠিক ওপরে অবস্থিত বেকারিটি, যা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে তদারকি ব্যবস্থা ঢের জোরদার করা হয়েছে ।
কেন সচল রাখা জরুরি এই লাইফলাইন? গত প্রায় তিন দশক ধরে আদ্-দ্বীন মূলত এ দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের সাশ্রয়ী মূল্যের সেবাসদন হিসেবে কাজ করছে । শুধুমাত্র মগবাজারের আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই বিগত ২৯ বছরে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ Visitors বা রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে । ১১ জুন ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন এর বহির্বিভাগে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন, যা প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা অবিচল । এই হাসপাতালের সাথে সরাসরি ১,৭৯০ জন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মী যুক্ত রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই নারী । এছাড়া, আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজে ২০৯ জন বিদেশী শিক্ষার্থীসহ মোট ৬৪৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন । হাসপাতাল বন্ধ বা শাটডাউন করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এই দুই সহস্রাধিক চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিক্ষার্থীর পেশাগত ও শিক্ষাজীবন এক অন্ধকার অনিশ্চয়তায় পড়বে, যা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা সংকটকে আরও তীব্র করবে।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন আজ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, রোগীর নিরাপত্তা ও শতভাগ জবাবদিহিতার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ । ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ প্রোটোকলে ফিরে আসা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল আগামী দিনেও লাখো মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ চিকিৎসা প্রত্যাশীদের।
(আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন কর্তৃক ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত মূল প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:)
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
১৬ জুন ২০২৬
সম্প্রতি আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া শিশু মৃত্যু জনিত অনাকাংখিত ঘটনায় সমস্ত দেশের সাথে আমরাও গভীরভাবে শোকাহত । ইতোমধ্যে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে । এছাড়াও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রোটকল পূণর্মুল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিটি পরিবারকে ৮০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা (Ex Gratia Assistance), আজীবন স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, শিক্ষাবৃত্তি এবং কর্মসংস্থান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে ।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আমাদের অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে দৃঢ়ভাবে ইচ্ছুক । আমরা ইতোমধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ পুরোদমে শুরু করেছি । আলো-বাতাস চলাচল তথা অক্সিজেনের উপস্থিতি সুগম করার জন্য তিনজন ইন্ডিপেনডেন্ট কনসালটেন্ট এর নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের কাজ চলমান । কর্পোরেট অফিসের উপরে অবস্থিত বেকারিটি আমরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছি ।
Institutions এর নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন তার দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন এবং পরিচালনা পর্ষদ এই দায়িত্ব অধ্যাপক জামালুন্নেসা পিএইচডি'র উপর ন্যস্ত করেছেন । উল্লেখ্য, অধ্যাপক জামালুন্নেসা বিগত ২৫ বছরের অধিক সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীববিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষাকতা করে সম্প্রতি স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন । তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীববিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিকাল মেডিসিন থেকে পিএইচডি লাভ করেন ।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন ১৯৮০ সাল থেকে সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আয়বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে । বর্তমানে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের অধীনে ৯ টি হাসপাতাল, ৫ টি মেডিকেল কলেজ, ১ টি নার্সিং কলেজ, ৪ টি নার্সিং ইনস্টিটিউট, ১ টি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, ১ টি কলেজিয়েট স্কুল এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে ।
শুধুমাত্র আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মগবাজার ঢাকায় বিগত ২৯ বছরে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ ৭৩ হাজার ২৯১ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে এবং ১১ জুন ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন বর্হিবিভাগে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন । এই হাসপাতালের সাথে সরাসরি ১,৭৯০ জন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মী যুক্ত রয়েছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী । আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজে বর্তমানে ২০৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ ৬৪৬ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন । দুই সহস্রাধিক চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা ও পেশাগত ভবিষ্যতের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ।
রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে আদ্-দ্বীন অঙ্গীকার করছে ।
তারিকুল ইসলাম মুকুল পরিচালক, কোম্পানী অ্যাফেয়ার্স
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন
