মঙ্গলবার,

১৬ জুন ২০২৬

|

আষাঢ় ১ ১৪৩৩

XFilesBd

দূর দূরান্ত থেকে এখনও রোগী আসছেন মগবাজারে

গরিবের হাসপাতাল বন্ধ হলে গরিব যাবে কই? আদ্-দ্বীনের চেনা প্রাঙ্গণে লাখো মানুষের অলিখিত এ প্রশ্নই বাতাসে ভাসছে

সুব্রত সরকার

প্রকাশিত: ০৪:৫৯, ১৬ জুন ২০২৬

গরিবের হাসপাতাল বন্ধ হলে গরিব যাবে কই? আদ্-দ্বীনের চেনা প্রাঙ্গণে লাখো মানুষের অলিখিত এ প্রশ্নই বাতাসে ভাসছে

সকাল হতেই রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পা ফেললে মনে হবে, এটি কেবল একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়—এ যেন এ দেশের খেটে খাওয়া, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার এক মহা-সমাবেশ। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষের ভিড়ে সকাল থেকেই এখানে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। কোলে অসুস্থ শিশু নিয়ে অপেক্ষারত মা, কিংবা সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত দিনমজুর স্বামী—সবার চোখেই এক বুক আশা। কারণ তারা জানেন, এই হাসপাতালের চৌকাঠ পার হতে পারলে টাকার অভাবে কেউ চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে না। কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত নবজাতক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন এই ৭০০ বেডের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটিকে ‘শাটডাউন’ বা বন্ধ করে দেওয়ার একটি প্রশাসনিক হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তখন চিকিৎসা নিতে আসা লাখো মানুষের মনে একটাই সুতীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—‘গরিবের এই হাসপাতাল বন্ধ হলে, আমরা গরিবেরা শেষ পর্যন্ত যাব কই?’

বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের চিত্র অত্যন্ত নির্মম। একদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোর উপচে পড়া ভিড়, যেখানে একটা শয্যা বা সিট পাওয়া লটারি জেতার চেয়েও কঠিন। অন্যদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর চোখ ধাঁধানো আলো আর ফাইভ স্টার মানের জাঁকজমক। কিন্তু সেই ফাইভ স্টার মানের হাসপাতালে ঢোকার সামর্থ্য কি এ দেশের সিংহভাগ মানুষের আছে? একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে সেইসব বিলাসবহুল বেসরকারি হাসপাতালের বিল মেটাতে গিয়ে জমি-জমা, ঘটিবাটি বিক্রি করে এক নিমেষে নিঃস্ব হয়ে যেতে হয়। ফাইভ স্টার হাসপাতালের কাউন্টারে যেখানে প্রতি পদে পদে হাজার হাজার টাকার বাণিজ্য, সেখানে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল গত তিন দশক ধরে সম্পূর্ণ বিপরীত এক মানবিক মডেল খাড়া করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, বাণিজ্যিক মানসিকতা ছাড়াও মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব।

১৯৯৭ সাল থেকে যাত্রা শুরু করা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল আজ মূলত 'গরিবের সেবাসদন' হিসেবেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই ৭০০ বেডের বিশাল হাসপাতালের ৩০০টি বেডই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গরিব, দুস্থ ও অসহায় রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা সংরক্ষিত থাকে। যেখানে থাকা, খাওয়া বা সিট ভাড়ার জন্য রোগীদের ন্যূনতম কোনো টাকা দিতে হয় না। ঢাকার বুকে এমন নিঃস্বার্থ দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়টি মেলা ভার। শুধু তাই নয়, ঢাকার মোট শিশু প্রসবের প্রায় ৩ শতাংশ এককভাবে এই হাসপাতালেই সম্পন্ন হচ্ছে। অন্য যেকোনো নামী বেসরকারি হাসপাতালে যে টেস্ট বা ডেলিভারির জন্য লাখ টাকার বাজেট করতে হয়, আদ্-দ্বীনে খুব অল্প টাকায়, সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে সেই কাঙ্ক্ষিত এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। যেসব অতি দরিদ্র মানুষের এই সামান্য সাশ্রয়ী খরচটুকু দেওয়ারও সামর্থ্য থাকে না, হাসপাতালের মালিক ডা. শেখ মহিউদ্দিন নিজ তহবিল থেকে তাদের আরও বড় অঙ্কের আর্থিক সাহায্য দিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এই নিপাট ভদ্র ও রাজনীতিবিমুখ মানুষটির মানবিক দর্শনই আদ্-দ্বীনকে সাধারণ মানুষের প্রথম পছন্দে পরিণত করেছে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং বেদনাদায়ক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নিজেদের ভুলত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই দুঃখজনক ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে যারা আজ পুরো হাসপাতালটিকেই চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে, তারা আসলে কার স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে? আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কোনো বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কারণ তারা কোনো বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা করে না। কিন্তু তাদের এই সাশ্রয়ী ও মানসম্মত সেবার কারণে অনেক অতি-মুনাফালোভী কর্পোরেট মহলের একচেটিয়া ব্যবসা যে মার খাচ্ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আদ্-দ্বীন বন্ধ হলে সেইসব ফাইভ স্টার হাসপাতালের সিন্ডিকেটের লাভ হবে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের কপালে জুটবে কেবলই মৃত্যু আর হাহাকার।

বাস্তবতা হলো, কোনো চক্রান্ত বা নেতিবাচক প্রচারণাই সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘদিনের আস্থাকে টলাতে পারেনি। সাময়িক ছন্দপতন কাটিয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এখন আবার তার চেনা সেবার রূপে ফিরে এসেছে। গত কয়েক দিনের চিত্রই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বহির্বিভাগে প্রতিদিন হাজারেরও বেশি রোগী সেবা নিচ্ছেন এবং নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন জ্যামিতিক হারে। লক্ষ্মীপুর, গাজীপুর, নরসিংদী, কুমিল্লা বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা স্পষ্ট বলছেন, হাসপাতালে মানুষ মারা যেতেই পারে, কিন্তু তার জন্য এই হাসপাতাল বন্ধ করার চিন্তা করা মানে সাধারণ মানুষকে জ্যান্ত কবর দেওয়া।

সরকারের সব ধরনের রেগুলেটরি নীতিমালা মেনে চলা এই হাসপাতালের আইসিইউ এবং এনআইসিইউ-তে ইনফেকশন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। মাত্র ৩৮০ টাকায় রাজধানীর যেকোনো প্রান্তে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিয়ে আদ্-দ্বীন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা এ দেশের স্বাস্থ্যখাতে এক অনুকরণীয় ইতিহাস। তাই আবেগ বা কোনো অদৃশ্য মহলের ইশারায় চালিত না হয়ে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আদ্-দ্বীনের মতো একটি লাইফলাইনকে বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না; বরং এর ত্রুটিগুলো পরিমার্জন করে একে আরও উন্নত করার সুযোগ দেওয়াটাই হবে প্রকৃত জনবান্ধব নীতি। আদ্-দ্বীন বাঁচলে বাঁচবে লাখো গরিবের প্রাণ, সুরক্ষিত থাকবে আগামীর সুস্থ বাংলাদেশ।