রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ছয় নবজাতকের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিস্ফোরক বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লাইসেন্স বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পেছনে ঘোরার যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন ও অসত্য' বলে দাবি করেছেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন। সোমবার (১৫ জুন) আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডা. মহিউদ্দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, “মন্ত্রী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন ‘প্রুফটা (প্রমাণ) দেখাতে’।”
প্রেক্ষাপট ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অভিযোগ: এর আগে গত ১৩ জুন নরসিংদীর মনোহরদীতে একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছিলেন যে, সরকারি সুবিধা পেতে এখন আর কাউকে ঘুষ দিতে হয় না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে তাঁর পেছনে ঘুরেছিল, কিন্তু তিনি হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে যখন ডা. মহিউদ্দিনকে এই ঘুষের বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি কিছুটা কৌশলী অবস্থান নিয়ে বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কথা বলব না, মন্ত্রী মহোদয়ই বলবেন।”
হাইকোর্টের রিট নিয়ে অবস্থান: লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যে রিট করা হয়েছে, তার সাথে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানানো হয়। ডা. মহিউদ্দিন বলেন, একজন আইনজীবী সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই রিটটি দায়ের করেছেন।
শিশু মৃত্যুর কারণ এখনো ধোঁয়াশায়: ছয় নবজাতকের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ডা. শেখ মহিউদ্দিন জানান, ঠিক কী কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি এবং মৃত শিশুদের ময়নাতদন্তও (পোস্টমর্টেম) করা হয়নি। সরকারি প্রতিবেদনে ভেন্টিলেশনের (আলো-বাতাস চলাচল) বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, আদ্-দ্বীনের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে বর্তমানে যে মাত্রার গ্যাস পাওয়া গেছে, তা সরাসরি শিশু মৃত্যুর কারণ হওয়ার মতো নয়। তবে নবজাতকেরা যেহেতু অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুরোদমে চলছে সংস্কার কার্যক্রম: তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো দূর করতে ইতোমধ্যে হাসপাতালে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন পরিমাপের আধুনিক যন্ত্র কেনা হয়েছে এবং প্রতিটি কক্ষ নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরামর্শক দলে একজন বুয়েট প্রকৌশলী, একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছেন। ডা. মহিউদ্দিন জানান, সাম্প্রতিক পরীক্ষায় হাসপাতালের কোনো কক্ষেই কার্বন ডাই-অক্সাইডের উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি পাওয়া যায়নি। এটি বাইরের পরিবেশের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও তা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যেই রয়েছে। তারপরও রোগীদের সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কক্ষে 'পজিটিভ এয়ার প্রেসার' ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়ে যেতে পারে। শিশু ওয়ার্ডসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে ইতোমধ্যে এই কাজ শেষ হয়েছে। হাসপাতালের একটি সিলগালা করা ওয়ার্ডের চাবি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে, যা পাওয়া গেলেই এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত সংস্কার কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বেকারি বন্ধ ও শ্রমিক পুনর্বাসন: হাসপাতালের ওপরের তলায় থাকা বেকারিটির লাইসেন্স সংক্রান্ত কোনো জটিলতা ছিল না উল্লেখ করে ডা. মহিউদ্দিন বলেন, সরকারের আপত্তির কারণে আপাতত এর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে কর্মরত প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ শ্রমিকের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং বেকারিটি অন্য জায়গায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
আশ্বাস মেলেনি, আইনের পথেই হাঁটবে আদ্-দ্বীন: সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়নি জানিয়ে নির্বাহী পরিচালক বলেন, সমস্যাগুলো সমাধান করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে। বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় ৬০ জন সংকটাপন্ন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে অন্যত্র স্থানান্তর করা অসম্ভব। তাই সরকারের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী আগামী ৩০ দিনের মধ্যেই আপিল করা হবে। আপিলের আবেদনপত্র ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
