রোববার,

০৫ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ২০ ১৪৩৩

XFilesBd

আলো-আঁধারির সন্ধিক্ষণে অসমাপ্ত আড্ডা

সাঁঝবাতি নিভতেই বন্ধ সংস্কৃতির কপাট: কাঁটাবন-আজিজের বইবাজারে ধস

ড. অখিল পোদ্দার

প্রকাশিত: ০৪:১৬, ৪ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০৪:১৭, ৪ জুলাই ২০২৬

সাঁঝবাতি নিভতেই বন্ধ সংস্কৃতির কপাট: কাঁটাবন-আজিজের বইবাজারে ধস

আলো-আঁধারির সন্ধিক্ষণ এবং একটি অসমাপ্ত আড্ডা

- ড. অখিল পোদ্দার

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নয়টা। কাজের শেষে বাসায় সামান্য বিশ্রাম নিয়ে লেখক, কবি-সাহিত্যিক-অধ্যাপকেরা সবে আসতে শুরু করেছেন দার্শনিক আড্ডায়। কথাবার্তা, যুক্তি-দর্শন কেবলই জমে উঠেছে। আর তখনই ধপ করে লাইট বন্ধ। হঠাৎ অন্ধকার চারপাশ। পুরো মার্কেট নিরব হয়ে উঠলো। গোল্লায় চলমান যুক্তি-দর্শন। বন্ধ হয়ে গেলো দিনশেষে মনের খোরাক। বিদ্যুতের বাঁধা নিয়মের পর এভাবেই চলছে শাহবাগ-কাঁটাবনের আড্ডা। কেউ কেউ আসেন না কম সময় পাবেন বলে। কারণ অফিসের কাজ সারতেই বেজে যায় ৭ টা ৮ টা। তাহলে জ্যাম ঠেলে কাঁটাবন গিয়ে কী লাভ?

পরিবেশ যা বলছে:

শাহবাগের চত্বর পেরিয়ে কাঁটাবন কনকর্ড এম্পোরিয়ামের ভূগর্ভস্থ করিডোরে কিংবা আজিজ সুপার মার্কেটের দোতালার সংকীর্ণ গলিতে তখন কেবল প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে কোনো তরুণ গবেষক হয়তো সবেমাত্র উল্টাতে শুরু করেছেন কাঙ্ক্ষিত কোনো লিটল ম্যাগাজিনের পাতা; কোনো প্রবীণ সাংবাদিক বা কলামিস্ট চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সবেমাত্র শুরু করেছেন সমসাময়িক ভূরাজনীতি কিংবা সাহিত্যের নতুন বাঁক নিয়ে তুমুল এক বিতর্ক। ঠিক তখনই মার্কেটের মাইকে ভেসে আসে সেই চেনা, অথচ যান্ত্রিক ও রূঢ় ঘোষণা-সম্মানিত গ্রাহক ও ব্যবসায়ী ভাইসব, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মার্কেট বন্ধের সময় ঘনিয়ে এসেছে। দয়া করে আপনারা আপনাদের দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিন।’

মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় দৃশ্যপট। বইয়ের তাকের ওপর নেমে আসে ঝাপসা শাটারে অন্ধকার। যে পাঠকটি সারাদিনের নাগরিক ক্লান্তি শেষে কেবলই বইয়ের ঘ্রাণে একটু জিরিয়ে নিতে এসেছিলেন, তাকে আধা-পঠিত বইটি টেবিলে রেখে বিমর্ষ মুখে বেরিয়ে আসতে হয়। লেখক-বুদ্ধিজীবীদের জমে ওঠা আড্ডার খেই হারিয়ে যায় মাঝপথেই।

ঢাকা শহরের বাণিজ্যিক বিপণিবিতানগুলো রাত নয়টায় বন্ধ করার যে বৈশ্বিক বা জাতীয় জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি, তার কোপ এসে পড়েছে রাজধানীর জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার ফুসফুস হিসেবে পরিচিত বইয়ের মার্কেটগুলোর ওপর। জামাকাপড়, কসমেটিকস কিংবা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারের কেনাকাটার মনস্তত্ত্ব আর বই কেনার মনস্তত্ত্ব যে এক নয়—এই সাধারণ ধ্রুবসত্যটি আমাদের নগর পরিকল্পনাকারীদের ফাইলে বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। ফলে, যখনই শহরে মানুষের মেধা ও মননচর্চার সবচেয়ে উর্বর সময়টি ঘনিয়ে আসে, ঠিক তখনই নিয়মের যান্ত্রিক খাঁচায় বন্দি হয়ে আলো নিভে যায় কাঁটাবন আর আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোর।

বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডার আঁতুড়ঘর: ঐতিহ্য বর্তমান

বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সমান্তরালে হেঁটেছে কফি হাউস কিংবা বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা। আশির দশকের শেষভাগ থেকে সেই আড্ডার ভরকেন্দ্র স্থানান্তরিত হতে শুরু করে শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট এবং পরবর্তী সময়ে কাঁটাবন কনকর্ড এম্পোরিয়ামে। বিশেষ করে আজিজ সুপার মার্কেট কেবল একগুচ্ছ বইয়ের দোকানের সমষ্টি নয়, এটি বাংলাদেশের বিকল্প সংস্কৃতি, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন এবং তরুণ লেখকদের আত্মপ্রকাশের প্রধানতম চত্বর। এখানে একই সারিতে হেঁটে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রথিতযশা অধ্যাপক, প্রবীণ কবি, তরুণ নাট্যকর্মী কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিক। কাঁটাবন কনকর্ড মার্কেটের প্রকাশনা সংস্থা ও বইয়ের দোকানগুলোও গত দুই দশকে চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য এক অনন্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, অনুবাদ সাহিত্য থেকে শুরু করে দুষ্প্রাপ্য খবরের কাগজের আর্কাইভ—কী নেই এখানে!

এই আড্ডাগুলো কিন্তু নিছক সময় কাটানো বা ‘আষাঢ়ে গল্প’ নয়। ঢাকা শহরের এই বিশেষ বইয়ের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে যে বুদ্ধিবৃত্তিক লেনদেন ঘটে, তা থেকে জন্ম নেয় নতুন পত্রিকার আইডিয়া, নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি, নাটকের খসড়া কিংবা কোনো সামাজিক আন্দোলনের রূপরেখা। যখন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একজন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকের মুখোমুখি হন, তখন তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে মেলবন্ধন ঘটে রূঢ় বাস্তবতার। এই মেলবন্ধনই সমাজকে পথ দেখায়। কিন্তু বর্তমান সময়সূচির গ্যাঁড়াকলে পড়ে এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ক্রেতা-পাঠকের সংকট: মনস্তত্ত্ব বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

একজন সাধারণ পাঠক বা বই ক্রেতার প্রাত্যহিক রুটিন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার যানজট ও অফিস আদালতের সময়সূচি মেনেই তাকে চলতে হয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাপ্তরিক কাজ শেষ হতে হতে বিকেল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা বেজে যায়। কারও আরও বেশিক্ষণ থাকতে হয়। এরপর তীব্র যানজট ঠেলে একজন মানুষের পক্ষে কাঁটাবন বা আজিজে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছুঁয়ে ফেলে।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে, বই কোনো জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার নয় যে মানুষ তাড়াহুড়ো করে গিয়ে চাল-ডাল কেনার মতো তুলে নিয়ে আসবে। বই কিনতে প্রয়োজন শান্ত মন, কিছুটা অবসর এবং বইয়ের প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র উল্টেপাল্টে দেখার স্বাধীনতা। সাড়ে আটটায় একজন পাঠক যখন মার্কেটে প্রবেশ করেন, তখন তার মাথায় ঝুলতে থাকে নয়টায় মার্কেট বন্ধ হওয়ার খড়গ। দোকানদাররাও তখন তড়িঘড়ি করে তাক গোছাতে ব্যস্ত থাকেন, শাটার অর্ধেক নামিয়ে দেন। এমন এক তাড়া-খাওয়া দমবন্ধ পরিবেশে আর যাই হোক, বইয়ের মতো একটি ধীষণাগত পণ্যের বিপণন ও সমঝদারি সম্ভব নয়।

ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে—পাঠকেরা ধীরে ধীরে বইবিমুখ হয়ে পড়ছেন অথবা অনলাইনের যান্ত্রিক কেনাকাটায় অভ্যস্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু অনলাইন বুকশপ কখনোই আজিজ বা কাঁটাবনের সেই জীবন্ত স্পর্শ, লেখকদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় আর বই উল্টে দেখার অনাবিল আনন্দের বিকল্প হতে পারে না।

প্রকাশকদের হাহাকার সংকীর্ণ হচ্ছে ব্যবসার পথ

কাঁটাবন ও আজিজ সুপার মার্কেটের বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সাথে কথা বললে তাদের চোখে-মুখে হতাশার স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আজিজের এক প্রবীণ প্রকাশক আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের মূল কাস্টমার যারা—শিক্ষক, ছাত্র, গবেষক বা চাকরিজীবী—তারা আসেই রাতে। অথচ নয়টা বাজতে না বাজতেই আনসার বা সিকিউরিটি গার্ডরা এসে বাঁশি বাজানো শুরু করে। দিনে আমাদের যেটুকু বিক্রি হতো, তার ৭০ শতাংশই হতো সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টার মধ্যে। এখন দিনের পর দিন আমরা মূল ব্যবসার সময়টাতেই দোকান বন্ধ করে বসে থাকি। এভাবে কতদিন টেকা যায়?

বইয়ের ব্যবসা অন্য দশটা ব্যবসার মতো চড়া মুনাফার জায়গা নয়। অনেক প্রকাশকই কেবল সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এবং নিজের ভেতরের তাড়না থেকে বছরের পর বছর লোকসান গুনেও দোকান টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ব্যবসার প্রধান সময়টুকুই যদি নিয়মের বেড়াজালে আটকে যায়, তবে এই প্রকাশনা শিল্প অচিরেই ধ্বংসের মুখে পড়বে। অনেকেই ইতোমধ্যে দোকান ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, কেউ কেউ বইয়ের দোকানের পরিধি কমিয়ে অন্য ব্যবসায় ঝুঁকছেন, যা একটি দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডের জন্য চরম আশঙ্কাজনক।

সংস্কৃতি বনাম জ্বালানি সাশ্রয়: ভারসাম্য কোথায়?

জ্বালানি সাশ্রয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি সিদ্ধান্তকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশের নাগরিক হিসেবে শিল্প-সংস্কৃতির সাথে যুক্ত মানুষেরাও এই সংকটের অংশীদার। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ব্যবস্থাপনার বৈষম্য ও অগ্রাধিকার নিয়ে। শহরের কাঁচাবাজার, রেস্তোরাঁ কিংবা বিনোদন কেন্দ্রগুলো যেখানে বিশেষ বিবেচনায় গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকছে, সেখানে কেন বইয়ের মতো মননশীল চর্চার জায়গাকে একই লাঠিতে মাপা হবে? একটি পোশাকের দোকান বা কসমেটিকসের দোকান সারাদিন ধরে যে পরিমাণ ক্রেতা পায়, বইয়ের দোকানের চিত্র তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বইয়ের বাজার মূলত ‘সান্ধ্যকালীন বাজার।

বুদ্ধিজীবী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্র যখন মদের দোকান, ফাস্টফুডের দোকান বা শপিংমলগুলোকে দীর্ঘ সময় খোলা রাখার অনুমতি দিতে পারে, তখন বইয়ের দোকানের ক্ষেত্রে মাত্র দুই বা তিন ঘণ্টার শিথিলতা দেওয়া কোনো অবাস্তব দাবি নয়। বিদ্যুৎ সাশ্রয় যদি মূল লক্ষ্য হয়, তবে বইয়ের দোকানগুলোতে বিকল্প উপায়ে (যেমন কম শক্তির এলইডি আলো ব্যবহার করে বা শীতাতাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ রেখে) রাত ১১টা বা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

অন্ধকারচ্ছন্ন নগরী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিপদ

একটি শহর শুধু ইট-পাথর, ফ্লাইওভার আর নিয়ন আলোর সমষ্টি নয়। শহরের একটি নিজস্ব আত্মা থাকে, যা বেঁচে থাকে তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মুক্তচিন্তা আর আড্ডার মধ্য দিয়ে। ঢাকা শহর এমনিতেই ক্রমশ পার্ক, খেলার মাঠ আর মুক্ত বাতাসহীন এক কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের সামনে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। তারা ঝুঁকছে মাদকের দিকে, কিংবা বন্দি হয়ে পড়ছে স্ক্রিন অ্যাডিকশনের চোরাবালিতে।

এমন একটি সময়ে কাঁটাবন বা আজিজ সুপার মার্কেটের মতো জায়গাগুলো ছিল তরুণদের জন্য এক টুকরো মরূদ্যান। এখানে এসে তারা অগ্রজদের কথা শুনত, বিশ্বরাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, নিজের লেখা কবিতাটি পড়ে শোনাত। রাত ৯টা যখন এই মরূদ্যানের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়, তখন পরোক্ষভাবে আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এক চরম শূন্যতা ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিই। বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা থেকে যদি নতুন চিন্তার জন্ম না হয়, তবে সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে। আর স্থবির সমাজেই জন্ম নেয় উগ্রবাদ ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান: বইবাজারের জন্য বিশেষ নীতিমালা চাই

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু খুব জটিল নয়, প্রয়োজন শুধু নীতিনির্ধারকদের একটু সংবেদনশীল ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি। সংস্কৃতি কর্মী, লেখক এবং প্রকাশকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই কিছু যৌক্তিক দাবি তোলা হচ্ছে:

ক. বইবাজারের জন্য বিশেষ সময়সূচি: কাঁটাবন কনকর্ড, আজিজ সুপার মার্কেট এবং বাংলাবাজারের মতো সুনির্দিষ্ট বইয়ের মার্কেটগুলোকে সাধারণ বাণিজ্যিক শপিংমলের ক্যাটালগ থেকে বের করে ‘সাংস্কৃতিক জোন’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এদের বন্ধের সময়সীমা অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত বর্ধিত করা সময়ের দাবি।

খ. সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের শর্ত: প্রকাশকেরা সান্ধ্যকালীন বাড়তি সময়ে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বন্ধ রেখে কেবল প্রয়োজনীয় আলো জ্বালিয়ে দোকান সচল রাখার মুচলেকা দিতে প্রস্তুত। রাষ্ট্র এই শর্তে তাদের ছাড় দিতে পারে।

গ. মুক্তমঞ্চ ও আড্ডার স্থান সংরক্ষণ: মার্কেটগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ যাতে আড্ডার উপযোগী থাকে এবং পাঠক ও লেখকেরা যাতে নির্বিঘ্নে মতবিনিময় করতে পারেন, তার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মার্কেট কর্তৃপক্ষের বিশেষ নির্দেশনা প্রয়োজন।

বাতি যেন না নেভে স্বপ্নের:

নয়টার পর যখন আজিজ বা কাঁটাবনের অন্ধকার করিডোর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আসতে হয়, তখন মনে হয় এ যেন কেবল একটি মার্কেটের বাতি নেভা নয়, এ যেন এক পুরো প্রজন্মের স্বপ্ন ও চিন্তার ওপর অন্ধকারের পর্দা পড়ে যাওয়া। যে আড্ডা থেকে দেশের বড় বড় সাহিত্যিক, সাংবাদিক বা শিক্ষকেরা আলোর দিশা পেয়েছেন। সেই আড্ডাকে এভাবে অকালমৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। অর্থনৈতিক সাশ্রয় অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সংস্কৃতির অপমৃত্যু ঘটিয়ে যে সাশ্রয়, তা দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে দেউলিয়া করে দেয়। আমরা আশা করব, নীতিনির্ধারকেরা অবিলম্বে এই বাস্তবতার গুরুত্ব অনুধাবন করবেন। ভাঙা আড্ডাগুলো আবার জোড়া লাগুক, চায়ের কাপে আবার উঠুক ঝড়, আর সন্ধে নামার পর ঢাকা শহরের কাঁটাবন আর আজিজের বইয়ের তাকগুলো যেন আবার আলোকিত হয়ে ওঠে পাঠকের তৃষ্ণার্ত চোখের আলোয়। কারণ, বইয়ের আলো নিভে গেলে যে অন্ধকার নেমে আসে, তা কোনো জেনারেটর দিয়েও দূর করা সম্ভব নয়।

[ড. অখিল পোদ্দার, বিশিষ্ট সাংবাদিক, কবি ও গবেষক]