কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার গোপগ্রাম ইউনিয়নের অধীনে অবস্থিত ঐতিহাসিক তিন গ্রাম—সাতপাথিয়া, বরইচারা ও উত্তর রঘুনাথপুর। বহু দশক ধরে এই এলাকার হাজারো মানুষ সুখে-দুঃখে এক হয়ে শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু আজ সেই চিরচেনা শান্তির জনপদে নেমে এসেছে এক থমথমে পরিবেশ। বুকচাপা কান্না ও গভীর হাহাকার সেখানকার বাতাসে। মানুষের জীবদ্দশায় নানা মতপার্থক্য, সামাজিক টানাপড়েন কিংবা বিরোধ থাকতে পারে; কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন একজন মানুষের মৃতদেহের জন্য সাড়ে তিন হাত মাটির আকুতি জানাতে হয়, আর দাফনের স্থানটিতেই দাঁড়িয়ে যায় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দেয়াল, তখন মানবতা ও ধর্মীয় অনুভূতির সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন এসে দাঁড়ায়। খোকসার বরইচারা ও উত্তর রঘুনাথপুরবাসীর চোখের জলে আজ সেই করুণ প্রশ্নই কেঁদে ফিরছে—মৃত্যুর পরও কি একজন মানুষ একটু সম্মানজনক ও শান্তিময় দাফন পাওয়ার অধিকার রাখে না?

এই করুণ সংকট ও সংঘাতের শিকড় লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমিতে। খোকসার এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের শেষ ঠিকানার কথা চিন্তা করে আজ থেকে বহু আগে, আনুমানিক ১৯৪২ সালে সততা ও মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাতপাথিয়া গোরস্থানটি প্রতিষ্ঠিত করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে বাল্লক ব্যাপারি কর্তৃক একোয়ার্ড ওয়াকফভুক্ত স্টেট নিলাম ক্রয়ের মাধ্যমে এই গোরস্থানের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। সেই সময় সাতপাথিয়া গ্রামের ডালিম হোসেন, মো. আলিমুদ্দিন মুন্সী, মো. আবদুল জলিল খানসহ বরইচারা গ্রামের মো. ফরাতুল্লা শেখ, মণ্ডল মুন্সী ও মো. হারান শাহ যৌথ উদ্যোগ নিয়ে এই গোরস্থানকে সর্বসাধারণের জন্য গড়ে তোলেন।

পরবর্তীতে এলাকার কিংবদন্তিতূল্য চেয়ারম্যান শামছুদ্দিন খান, ডা. মো. আবদুল কুদ্দুসসহ বরইচারা ও রঘুনাথপুরের বহু শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ও জমি দান করে, মাটি ভরাট করে, বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ করেণ। পরে তাতে অসংখ্যা ছায়াবৃক্ষ রোপন করে গোরস্থানের সৌন্দরয বর্ধন করেন। দীর্ঘ সাড়ে আট দশক ধরে এই গোরস্থানেই শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন বরইচারা, উত্তর রঘুনাথপুর ও পার্শ্ববর্তী সাতপাখিয়া গ্রামের হাজারো মানুষের বাবা-দাদা, মা-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষেরা।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্য যে, সময়ের বিবর্তনে ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে এই পবিত্র গোরস্থানের ওপর নেমে আসে কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কুনজর। গোরস্থানের সম্পত্তি নিজ দখলে রাখা, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার এবং অবৈধভাবে গোরস্থানের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রির অনিয়মকে কেন্দ্র করে সাতপাথিয়া গ্রামের একাংশের সাথে বরইচারা ও উত্তর রঘুনাথপুরবাসীর দ্বন্দভেদে বিরোধের সৃষ্টি হয়। গত ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গোরস্থানের গাছ কাটা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রায় ১৪ থেকে ১৫ জন লোক মারাত্মকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এই বিরোধের চরম ও হৃদয়বিদারক রূপ সামনে আসে ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে, যখন বরইচারা গ্রামের এক বৃদ্ধা মহিলা মারা যান। স্বজনেরা যখন চোখের জল মুছতে মুছতে সেই শত বছরের পুরনো গোরস্থানে লাশ দাফন করতে যান, তখন বিবাদী পক্ষ চরম নির্মমতায় কবর খোঁড়ার কাজে বাধা সৃষ্টি করেন। ঘোষণা দেযন যে, বরইচারা ও উত্তর রঘুনাথপুরের কাউকে আর এই গোরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না। এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রহমত ওরফে রকো সর্দার নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রশাসন উপস্থিত থেকেও নিরাপত্তা দিতে না পারায় স্বজনরা বাধ্য হয়ে কফিনে মোড়ানো লাশ নিয়ে ফিরে আসেন। পরে রকো সর্দারের লাশ বরইচারা গ্রামের হিন্দু পাড়ার বাগানে তথা বাদি সংলগ্ন এলাকায় দাফন করতে হয়। নিজের বাপ-দাদার শত বছরের গোরস্থানে ঠাঁই না পেয়ে স্বজনের লাশ বাড়ির আঙিনায় মাটিচাপা দেওয়ার এই যন্ত্রণা খোকসাবাসী কোনোদিন ভুলতে পারবে না।

ইসলামি শরিয়াহ এবং পৃথিবীর যেকোনো মানবিক দর্শনের আলোতেই এই ঘটনা চরম অপরাধ, কবিরা গুনাহ ও পরম অমানবিক কাজ বলে মনে করেন স্থানীয় শমসপুর গ্রামের একাধিক মুরুব্বিজন ও মাতুব্বর। নাম প্রকাশ না শর্তে তাঁরা বলেন, সাতপাখিয়া গ্রামের লোকজন এমপির প্রতাপ দেখাচ্ছে। আবার বরইচারা গ্রামের লোকজনেরও কিছু ভুল আছে। তবে আমরা মুসুলমান-সবাই ভাই ভাই। কবরস্থানে দাফন সংক্রান্ত ব্যাপারে সত্যিকার মুসুলমানের মধ্যে কোন বিরোধ থাকতে পারে না। আমরা মনে করি, বরইচারা ও সাতপাখিয়া গ্রামের শিক্ষিতজন ও মুরুব্বিরা মিলে বসে সমস্যাটি সমাধান করতে পারেন। এতেকরে দুই গ্রামের মানুযষেরই সম্মান হানি ঘটছে। তারপরও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা কবর স্থান। মুসুলমানের দাফন নিয়ে কোন বিরোধ থাকতে পারে না। যতদিন এ সমস্যার সমাধান না হচ্ছে ততদিন দাফন কাজ বন্ধ করা উচিত নয়। সাতপাখিয়ার লোকজন যারা বাধা দিচ্ছে- তাদের ভুলে গেলে চলবে না, তাদেরও শেষ ঠিকানা ঐ কবরস্থানেই। হিংসার শিখা বুকে জ্বালিয়ে মরার কি দরকার?
পাশের মাসিলিয়া গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, ঘটনাটি তারা জানেন। এটি খুবই দুঃখজনক। ইসলামে মৃত মানুষের সম্মানকে জীবিত মানুষের সম্মানের মতোই পবিত্র ও অপরিবর্তনীয় বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য, আর মৃতকে সম্মানজনক দাফন দেওয়া গোটা মুসলিম সমাজের ওপর 'ফরজে কেফায়া'। যে জমি একবার আল্লাহর ওয়াস্তে সামাজিক গোরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত বা দান করা হয়েছে, তা ওয়াকফকৃত সার্বজনীন সম্পদ। সেখানে কোনো দলীয় প্রভাব, স্বার্থান্বেষী রাজনীতি বা ক্ষমতার জের ধরে কোনো মুসলমানের মৃতদেহের দাফনে বাধা দেওয়া ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না; বরং এটি ইসলামি চেতনা ও সুন্নাহর সরাসরি লঙ্ঘন। হিংসা বা সামাজিক বিরোধের জের ধরে লাশ দাফনে বাধা দেওয়া বা মৃতদেহকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো ইসলামি আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত এক মহাপাপ।

খোকসার বরইচারা ও উত্তর রঘুনাথপুর গ্রাম দুটিতে থমথমে নীরবতা আর চাপা আতঙ্কের অন্ধকার। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রবীণ মানুষগুলো গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের জীবনের শেষ দিনটিতে তারা কি তাদের শত বছরের পৈতৃক গোরস্থানে একটু ঠাঁই পাবেন, নাকি তাদের লাশকেও এমন অপমান সইতে হবে? কয়েক প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত এই গোরস্থান থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বা ৮১ শতক জমি বাদ দিয়ে তাদের বের করে দেওয়ার যে অন্যায্য প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, তা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। কারণ এটি কেবল মাটির হিসেব নয়, এটি তাদের চার পুরুষের কবর ও আবেগের প্রশ্ন।

মৃত্যুর পর মানুষের কোনো দল থাকে না, কোনো ধনী-দরিদ্রের দেয়াল থাকে না; থাকে শুধু সাড়ে তিন হাত মাটির এক টুকরো শেষ অধিকার। বরইচারা ও উত্তর রঘুনাথপুরের আপামর গ্রামবাসীর একটাই আকুল আবেদন—কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, খোকসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা পুলিশ প্রশাসন যেন অবিলম্বে এই বিরোধের সুষ্ঠু ও স্থায়ী সমাধান করেন। গোরস্থানের অবৈধ দখল ও অনিয়ম বন্ধ করে, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হুমকিকে প্রশ্রয় না দিয়ে এই ঐতিহাসিক গোরস্থানকে চার গ্রামের সম্মিলিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হোক। পবিত্র গোরস্থানে মৃত মানুষের মর্যাদা ও ইসলামি নীতি রক্ষা করে প্রতিটি মানুষের শেষ বিদায়কে শান্তিপূর্ণ করাই সময়ের সবচেয়ে বড় মানবিক দাবি।

